NewsNow24.Com
Leading Multimedia News Portal in Bangladesh

দুর্বিসহ গরমসহ প্রকৃতির কেনো এই রুদ্ররূপ?

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

আশীষ কুমার দে: প্রকৃতির বৈরী আচরণ গত কয়েকবছর ধরেই আমরা উপলব্ধি করে আসছি। তবে সেই রুঢ়তা এ বছর অনেক বেশি। ভরা বর্ষা মৌসুমে দেশের কোথাও ভারি বৃষ্টিপাত নেই। অস্বাভাবিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি। প্রচণ্ড গরমে জনজীবনে নাভি:শ্বাস উঠেছে। আবহাওয়াবিদরা বলছেন, বিশ্ব উষ্ণায়ন বা জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে এমন হচ্ছে।

বছরের প্রথমদিকে অসহনীয় গরম শুরু হয়েছিল। তবে বিভিন্ন স্থানে বিচ্ছিন্নভাবে বৃষ্টিপাত ও ঝড়-ঝঞ্ঝার কারণে সে গরম খুব বেশি অনুভুত হয়নি। মধ্য মার্চ থেকে এপ্রিলের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত প্রায় প্রতিদিনই কোনো কোনো জায়গায় প্রবল বর্ষণ, কালবৈশাখী ঝড়, বজ্রপাত হয়েছিল। এর ফলে প্রকৃতিতে উষ্ণতা কমার কথা ছিল। কিন্তু কমেনি, বরং তখন থেকে তাপমাত্রা বাড়তে থাকে।

তবে মে-জুনে সিলেটে প্রবল বর্ষণ হয়; যা অতীতের রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। ভারতের উজান থেকে আসা আন্ত:সীমান্ত নদী সুরমা ও কুশিয়ারার পানি, আসাম ও মেঘালয় রাজ্যের শত বছরের সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতের ফলে সৃষ্ট বিশাল জলরাশি ও পাহাড়ি ঢলে বৃহত্তর সিলেট অঞ্চল ভয়াবহ বন্যা কবলিত হয়ে পড়ে। প্রায় অভিন্ন সময়ে দেশের উত্তরাঞ্চলেও রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিপাত হয়। সেই সঙ্গে ব্রহ্মপুত্র ও তিস্তাসহ কয়েকটি আন্ত:সীমান্ত নদীর পানির তোড়ে লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রামসহ উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হয়।

তবে যে সময় প্রবল বর্ষণে সিলেটসহ পূর্বাঞ্চল এবং লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রামসহ উত্তরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ জনপদ বিপর্যস্ত হচ্ছিল, সে সময়ে দেশের অন্যান্য এলাকায় বৃষ্টির দেখা মেলেনি। এমনকি ব্রহ্মপুত্র ও তিস্তার পানি যমুনা ও পদ্মা হয়ে উত্তরাঞ্চল ছাপিয়ে দেশের মধ্যাঞ্চলের কিছু এলাকা প্লাবিত করলেও সে সব এলাকাও বৃষ্টিহীন ছিল। বন্যার ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলা করে ওইসব জনপদের মানুষ ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। তবে এখন চলছে বৃষ্টির জন্য হাহাকার। এই হাহাকার সারা দেশে। ভরা বর্ষা মৌসুমে পুরো দেশ দীর্ঘদিন যাবত বৃষ্টিহীন।

সাম্প্রতিককালে বিশেষ করে মে মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে এখন পর্যন্ত প্রকৃতিতে যে তাপমাত্রা বহমান আছে, তাতে রাজধানীসহ সারা দেশের জনজীবন বিষিয়ে উঠেছে। মানুষ এ বছর শ্রাবণের অঝর ধারার বর্ষণের শব্দ শুনতে পাচ্ছে না। উল্টো প্রচণ্ড তাপদাহে হাঁসফাঁস করছে। কবে নাগাদ মুষলধারে বৃষ্টি হবে আর তাপমাত্রা কমবে- খোদ আবহাওয়া বিজ্ঞানীরাও তা নিশ্চিত করতে পারছেন না।

কিন্তু কেনো এমন হচ্ছে, প্রকৃতির কেনো এই রুদ্ররূপ, তা-কি আমরা একবারও ভেবে দেখেছি? এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী কী প্রকৃতি, না মানুষ? অস্বাভাবিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি শুধু বাংলাদেশে নয়; যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও স্পেনসহ বিশ্বের অনেকগুলো উন্নত রাষ্ট্রের অবস্থা এ বছর আরও ভয়ংকর। শিল্পোন্নত দেশগুলো থেকে নি:সৃত লাখ লাখ টন বিষাক্ত কার্বন-ডাই অক্সাইড সারা বিশ্বের বায়ুমণ্ডলে মিশে গিয়ে উষ্ণতা বাড়াচ্ছে। আবহাওয়া বিজ্ঞানীরা এটাকেই বলছেন, বিশ্ব উষ্ণায়ন বা জলবায়ু পরিবর্তন। এজন্য উন্নত রাষ্ট্রগুলো দায়ী হলেও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে আমাদের মতো স্বল্পোন্নত বা উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলো। তাই নিঃসন্দেহে বলা যায়, উদ্ভূত পরিস্থিতি মনুষ্যসৃষ্ট।

তবে শিল্পোন্নত দেশগুলো লাখ লাখ টন কার্বন-ডাই অক্সাইড নি:সরণ করে বায়ুমণ্ডলকে দূষিত করলেও আমারা নিজেরা কী এর জন্য মোটেও দায়ী নই? বিশেষ করে বাংলাদেশের পরিস্থিতির জন্য অনেকাংশেই আমরা দায়ী। বৈশ্বিক সংকট থেকে নিজেদের রক্ষার জন্য যা করণীয় ছিল বা এখনো আছে, তা যথাযথভাবে করা হয়নি এবং এখনো করা হচ্ছে না।

উদ্ভূত পরিস্থিতির জন্য বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বহুমুখী কারণ রয়েছে। প্রধান কারণ হচ্ছে অপরিণামদর্শী উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন। বিশেষ করে মেগা প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন এ ক্ষেত্রে বেশি সংকট সৃষ্টি করছে। যেমন অপরিকল্পিত নগরায়ন, শিল্পায়ন ও আবাসন এবং সড়ক ও সড়ক যোগাযোগ অবকাঠামো নির্মাণ। এর ফলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ- নানাভাবেই আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি।

১. অপরিণামদর্শী উন্নয়ন তথা অপরিকল্পিত নগরায়ন, শিল্পায়ন ও আবাসনের আগ্রাসী তৎপরতার কারণে ভরাট, দূষণ ও দখলের কবলে পড়ে নদ-নদী, হাওর-বাওড়সহ প্রাকৃতিক জলসম্পদ, সুন্দরবনসহ প্রাকৃতিক বনাঞ্চল, কৃষিজমি, পাহাড় ও সমতলের সবুজ বৃক্ষরাজি নির্বিচারে ধ্বংস হচ্ছে।

২. যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও সম্প্রসারণের নামে দেশজুড়ে নিত্য-নতুন সড়ক ও সড়ক অবকাঠামো নির্মাণ করতে গিয়ে আগের সড়কগুলো ও এর দুই পাশের সারি সারি তালগাছসহ বহু বছরের পুরনো গাছ-গাছালি, বসতভিটা, ফসলিজমি, বিভিন্ন ধরনের বাগ-বাগিচা ধ্বংস এবং নদী, খাল ও বিলের ওপর সেতু, কালভার্ট ও স্লুইসগেট গেট নির্মাণ করে পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত করার মধ্য দিয়ে প্রাকৃতিক জলাভূমিকে ধ্বংস করা হচ্ছে।

৩. বিভিন্ন ধরনের উন্নয়ন প্রকল্পের শর্তে সড়কের পাশে বৃক্ষ রোপণের কথা উল্লেখ থাকে। এই শর্ত মেনে শহর ও গ্রামীণ জনপদ- সবখানেই নতুন সড়ক নির্মাণ এবং পুরনো সড়ক সংস্কারের ক্ষেত্রে সেখানকার বড় বড় গাছ কেটে ফেলা হয়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সেসব স্থানে পরিবেশ বান্ধব তালগাছসহ দেশীয় প্রজাতির পর্যাপ্ত গাছ লাগানো হয় না। এর পরিবর্তে লাগানো হয় ইউক্লিপটাস, আকাসিয়ার মতো ভিন দেশী প্রজাতির পরিবেশ বিনাশী গাছ। অথচ তাল, বট, শিরিশ, তেঁতুল, অশথ গাছ বিলুপ্তির কারণে সারা দেশে বজ্রপাতসহ নানা ধরনের পরিবেশ বিপর্যয়ের মাত্রা বহুগুণ বেড়ে গেছে।

৪. অপরিকল্পিত শিল্প-কারখানা ও ইটভাটার ধোঁয়ায় বাতাস যেমন ক্রমশ: উষ্ণ, ভারি ও দূষিত হচ্ছে, তেমনি শিল্প বর্জ্যে মারাত্মক দূষিত হচ্ছে আমাদের নদীগুলো। একসময়ে নদীতীরে বট ও অশ্বত্থসহ বড় বড় গাছ থাকলেও গত চার দশকে সেগুলো প্রায় নি:শ্বেষ হয়েছে। বর্তমান সরকার বিলুপ্ত নদীগুলো ধাপে ধাপে খনন শুরু করলেও প্রকল্প বাস্তবায়নে নদীতীরে বৃক্ষ রোপণের বাধ্যবাধকতা থাকছে না। এতে বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেনের পরিমাণ কমছে, আর কার্বন-ডাই অক্সাইডের মাত্রা বাড়ছে।

৫. অপরিণামদর্শিতা ও অবজ্ঞার কারণে নদী ও নৌপথ বিলুপ্ত হওয়ায় নৌ পরিবহন ব্যবস্থাও সংকুচিত হয়ে পড়েছে। যে কারণে ভূ-তলে বেড়েছে বাস, ট্রাক, টেম্পু, প্রাইভেট কারসহ হরেক রকমের সড়কযান; যার বিষাক্ত ধোঁয়া প্রতিনিয়ত বাতাসকে ভারি, দূষিত ও উষ্ণ করছে। সেই সঙ্গে ভয়াবহ শব্দ দূষণ হচ্ছে; যা জনজীবনের ওপর মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে।

৬ চিকিৎসা, উচ্চশিক্ষা ও কর্মের তাগিদে শহরমুখী জনস্রোত বৃদ্ধির কারণে রাজধানী ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে জমির চাহিদা ও মূল্য বেড়ে যাওয়ায় এসব স্থান থেকে দিনদিন কমছে গাছগাছালি এবং সরকারি-বেসরকারি জলাভূমি। এর বিপরীতে দ্রুতগতিতে বাড়ছে পাকা ইমারত তথা বহুতল ভবনের সংখ্যা। সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা নির্মাণের ক্ষেত্রে পরিবেশ রক্ষার নিয়মনীতি উপেক্ষিত হচ্ছে। এর ফলে উজাড় হচ্ছে বৃক্ষসম্পদ এবং ধ্বংস হচ্ছে প্রাকৃতিক খালসহ অসংখ্য জলাশয়।

সুতরাং ভয়াবহ এ সংকট থেকে উত্তরণ এখন সবচেয়ে জরুরি হয়ে পড়েছে। এজন্য দুটি পথ রয়েছে:

এক. বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে উন্নত রাষ্ট্রগুলোর কার্বন নি:সরণের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে ক্ষতিপূরণ আদায় এবং সেই অর্থ প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষায় যথাযথভাবে ব্যয় নিশ্চিত করতে হবে।

দুই. নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় সব ধরনের অপরিণামদর্শী ও পরিবেশ বিনাশী কার্যক্রম থেকে বিরত থাকতে হবে।

লক্ষ্য অর্জনে ওপরের দু’টি পথেই সমান্তরালভাবে হাঁটতে হবে আমাদেরকে।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, গবেষক ও অধিকারকর্মী।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

আপনার মতামত জানান

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More